পদ্মার ভাঙনে ৫ বার ভিটে হারানো সাহারার অনুপ্রেরণাদায়ী সাফল্য
ক্রেস্ট হাতে সাহারা আক্তার। আজ বৃহস্পতিবার সকালে শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায়
নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে পাঁচবার বাস্তুচ্যুত হওয়া একটি পরিবারের সন্তান সাহারা আক্তার চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চল রঞ্জন ছৈয়াল কান্দি এলাকার কৃষিশ্রমিক সিরাজ খানের ছয় মেয়ের মধ্যে সাহারা সবার ছোট। বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল অসম্ভব। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে দমে না গিয়ে সপ্তম শ্রেণি থেকেই গ্রামে ঘুরে বাড়ি বাড়ি টিউশনি শুরু করে সাহারা। সেই উপার্জনেই নিজের পড়াশোনার ব্যয় মিটিয়ে পদ্মাপাড়ের বড়কান্দি মডেল একাডেমি থেকে প্রথমবারের মতো জিপিএ-৫ পাওয়ার ইতিহাস গড়ে সে। বৃহস্পতিবার শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে সাহারা বলে, আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে সে এগিয়ে গেছে; সকালে ও বিকেলে টিউশনি করে গভীর রাত পর্যন্ত পড়েছে। চরাঞ্চলের নদীভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলোর দুঃখ-কষ্ট, উদ্বাস্তু জীবন এবং অর্থসংকটে মেয়েদের বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতার কথাও উল্লেখ করে সে।
‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানকে ধারণ করে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ৬৪ জেলায় আয়োজিত সংবর্ধনার অংশ হিসেবে শরীয়তপুরে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক তামিম হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি সত্যজিৎ ঘোষ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রদ্যুৎ কুমার দাস। তিনি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়াই যথেষ্ট নয়, ভেতরের প্রকৃত মানুষটিকে গড়ে তুলতে হবে। মজিদ জরিনা ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফরিদ আল হোসাইন বলেন, আজকের সংবর্ধিত এই কৃতিরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল বলেন, প্রযুক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলেও নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও নিজে শেখার অভ্যাস ধরে রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মালিহা রহমান ও ফারদিন আহমেদ এবং অভিভাবকদের পক্ষে নাসরিন আজিজ অনুভূতি প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের মাদক, মুখস্থ বিদ্যা এবং মিথ্যাকে বর্জনের শপথবাক্য পাঠ করান শরীয়তপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক শাহীন সরকার। দুই শিশুশিল্পীর নৃত্য ছাড়াও বন্ধুসভার সদস্যদের কবিতা ও ছড়া আবৃত্তিতে মুখর ছিল আয়োজনটি। পরে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে বই ও উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। জেলা বন্ধুসভার সভাপতি আবদুল মোতালেবের শুভেচ্ছা বার্তার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর আয়োজনে এ উৎসবটি ‘পাওয়ার্ড বাই বিকাশ’। আয়োজনের সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা এবং প্রথম আলো বন্ধুসভা।





আপনার মতামত লিখুন