সুন্দরবনের বাতাসে বিষবাষ্প: মানমাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র কণা
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুন্দরবনের কয়েটি স্থানে মানমাত্রার চেয়ে বেশি অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ এবং ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ১০ পাওয়া গেছে
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত দূষণের প্রমাণ মিলেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বনের খুলনা, সাতক্ষীরা, শরণখোলা এবং চাঁদপাই রেঞ্জে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার কয়েকটি পয়েন্টে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী সংস্থা সিইজিআইএস এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক এই ভিত্তিমূলক সমীক্ষা সম্পন্ন করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার আগারগাঁওয়ের বন ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এ সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যানগ্রোভ বনের বাতাসে আগে থেকেই থাকা লবণাক্ততার সঙ্গে এই দূষিত কণা যুক্ত হয়ে গাছপালা, মৌমাছি ও পাখিসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করে তুলছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শরণখোলা রেঞ্জে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫ পাওয়া গেছে ১০২ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০ পাওয়া গেছে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম। এর পরই দূষণের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চাঁদপাই রেঞ্জে প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা মিলেছে যথাক্রমে ৮৯.৩ ও ৯৮.১ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ‘বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২’ অনুসারে বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৩৫ এবং পিএম ১০-এর মাত্রা ৪৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে তা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে ডব্লিউএইচও-এর ২০২১ সালের নির্দেশিকায় পিএম ২.৫-এর নিরাপদ সীমা প্রতি ঘনমিটারে মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম। তবে সুন্দরবনের বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।
সিইজিআইএসের পরিবেশবিশেষজ্ঞ মুতাসিম বিল্লাহ জানান, মোংলা অঞ্চলের সিমেন্ট কারখানার জন্য পশুর নদের তীরের নিজস্ব জেটিতে ক্লিংকার এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পশুর চ্যানেলে কয়লা খালাসের সময়ে যে ধুলো ওড়ে, মূলত সেটাই এই অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মূল কারণ। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে দমকা হাওয়া এবং জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় উল্লিখিত ২১ শতাংশ আন্তদেশীয় দূষণও সুন্দরবনের বায়ুমানের অবনতিতে ভূমিকা রাখছে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ড এবং জাহাজ থেকে ক্লিংকার ও কয়লা খালাসের সময় নির্গত ফ্লাই অ্যাশ সুন্দরবনের বায়ুদূষণের প্রধান দুটি উৎস। এ ধরনের দূষণ রোধে নৌবাহিনী ও বন বিভাগের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবনের অস্তিত্ব শুধু বাঘ বা হরিণের ওপর নয়, বরং প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র প্রাণীদের ওপরও নির্ভরশীল। বায়ুদূষণের ফলে গাছের পাতা ও ফুলে ধূলিকণা জমে যাওয়ায় কীটপতঙ্গের মধু সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পরাগায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি যোগ করেন, রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মোংলার সিমেন্ট কারখানাগুলোর দূষণের যে শঙ্কা আগে থেকেই করা হচ্ছিল, এ গবেষণায় ঠিক সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মাঝারি মাত্রার এই দূষণও উদ্ভিদের সংকট বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং মাটি ও জোয়ারের পানির পুষ্টিচক্র ওলটপালট করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় পিএম ২.৫ ও সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো উপাদানগুলোর পাশাপাশি আবহাওয়াগত বিভিন্ন মাপকাঠি দীর্ঘমেয়াদে ও ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।





আপনার মতামত লিখুন