পাহাড়ের বুক চিরে আছড়ে পড়া জলরাশি আর কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের চোখে এটি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং বাংলাদেশের পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য অনুসন্ধানের একটি অনুপম প্রাকৃতিক গবেষণাগার। এখানকার ঝোপঝাড়, জলপ্রপাতসংলগ্ন মিশ্র চিরহরিৎ বন ও ঝরা পাতার স্তূপ অসংখ্য ছোট ও নিশাচর প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। বৃহত্তর পাথারিয়া পাহাড়ের অন্তর্ভুক্ত এই বনাঞ্চল বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা হয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও নির্বিচার বৃক্ষনিধন, দখলদারি এবং চা-বাগানের বিস্তৃতির ফলে বনটি বহুলাংশে সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে এককালে এখানে বিচরণ করা হাতি, গণ্ডার, বুনো মহিষ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, গৌর ও সাম্বারের মতো বৃহৎ স্তন্যপায়ীরা চিরতরে হারিয়ে গেছে। সংলগ্ন দেশগুলোতে এসব প্রাণী এখনো টিকে থাকলেও মাধবকুণ্ডের খণ্ডিত বনাঞ্চলে এখন ছোট ও কম পরিচিত বন্য প্রাণীদের অস্তিত্বই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত এক যুগে এই ইকোপার্কের দৃশ্যপট দ্রুত বদলেছে। ২০১২ সালের আগস্টে যখন প্রথম জরিপ চালানো হয়, তখন পার্কের পথঘাট ছিল কাঁচা কিংবা ইট বিছানো এবং সেখানে বর্তমানের মতো চারতলা বিশ্রামাগার ছিল না; ছিল টিন বা টালির ছাউনিযুক্ত সাধারণ অবকাঠামো ও দোতলা একটি ভবনের অল্প কয়েকটি কক্ষ। খাবারের জন্য আগে থেকে বলে রাখতে হতো এবং দু-একটি দোকানে হস্তশিল্প ও বাগানের ফল বিক্রি হতো। তখন ঘন ও বুনো পরিবেশে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ, পাখি ও উভচরের অবাধ বিচরণ দেখা যেত। এমনকি ভারী বৃষ্টিপাতও গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করত, যার মাধ্যমে বেশ কিছু প্রাণী দেশে প্রথমবার নথিভুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ডিসেম্বরের এক সফরে ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতের রাতে প্রজননের উদ্দেশ্যে পানিতে নামা বুনো বারডমোরের সরু মাথা ব্যাঙের দেখা মিলেছিল। সেখানে দুই থেকে তিন ডজন পুরুষ ব্যাঙকে ডালপালা ও পানির কিনারে ডাকাডাকি এবং কয়েক জোড়াকে ডিম পাড়তে দেখা যায়।
বাংলাদেশের প্রাণিকুলের লাল তালিকা হালনাগাদ করার মাঠপর্যায়ের কাজের অংশ হিসেবে গত ১৫ আগস্ট মাধবকুণ্ডে আরেকটি জরিপ চালানো হয়। এর আগের দিন দলটি হামহাম জলপ্রপাত ও তৎসংলগ্ন বনে অনুসন্ধান শেষ করে ঘুরতি পথে এখানে আসে। বৃষ্টি সত্ত্বেও শত শত পর্যটক তখন ঝরনার পানিতে গোসল ও আনন্দ-উল্লাসে মত্ত ছিলেন। তীব্র কোলাহলের মধ্যেও বন্য প্রাণীর টিকে থাকার লড়াই লক্ষ্য করা যায়। দেখা মেলে চার থেকে ছয়টি অপরিণত চশমাপরা হনুমানের একটি দলের, যদিও সেখানে কোনো পূর্ণবয়স্ক সদস্য ছিল না। এছাড়া একটি কাঠবিড়ালিকে মানুষের ফেলে দেওয়া পেয়ারা খেতে এবং পথের পাশের গাছে একটি নিশাচর লজ্জাবতী বানরকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়। শেষ বিকেলে নজরে আসে ৫ ইঞ্চি বা ১২-১৩ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের অভিনব পাখি বনমালি বা মখমল-কপাল কীটকুড়ানি। নীলচে পিঠ, হালকা সাদাটে পেট, চোখা লাল ঠোঁট ও চোখে হলুদ বলয় থাকা এই পাখি কাঠঠোকরার মতো কাঠে ঠোকর না মেরে ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে গাছের বাকল ও ছত্রাকজাতীয় ছোপ থেকে পোকা খুঁজে খায়। পুরুষ পাখির কপালে কালো মখমলের মতো দাগ ঘাড় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, যা স্ত্রী পাখিতে অনুপস্থিত। তবে মানুষের উপস্থিতির কারণে জলপ্রপাতের পাদদেশে এক ঘণ্টারও বেশি সময় খুঁজে মাত্র একটি চোখা-মাথা পাহাড়ি ব্যাঙের দেখা মেলে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে পর্যটকদের প্রস্থান ঘটতেই মাধবকুণ্ড ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে। ঝরনার প্রবল শব্দের মাঝে চারপাশ যখন শান্ত হয়, তখন প্রায় ১০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ৩০টিরও বেশি চোখা-মাথা পুরুষ পাহাড়ি ব্যাঙের ডাক শোনা যায়, যা দিনের ভিড়ে সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিল। জলপ্রপাতের ধার থেকে ওঠার পথে প্রায় দেড় ফুট দীর্ঘ একটি অতিকায় কাঠিপোকার দেখা মেলে। পরবর্তীতে বিষধর সবুজ বোড়া এবং দ্রুত রাস্তা পার হতে থাকা একটি কালকেউটে সাপের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এছাড়া মাত্র ১০০ মিটারের ব্যবধানে মাঝারি গাছে তিনটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছোট গন্ধগোকুল বা ভাম এবং এক ঘণ্টারও কম সময়ে শিকাররত চারটি লজ্জাবতী বানর প্রত্যক্ষ করেন গবেষকরা। ঝিঁঝি পোকা ও সিকাডার অবিরাম ডাকে মুখরিত এই পরিবেশ প্রমাণ করে যে মাধবকুণ্ডে রাতের বেলা সম্পূর্ণ আলাদা এক প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
গবেষকদের মতে, একটি বন একই সাথে পর্যটন কেন্দ্র ও বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে, যদি পরিবেশের ধারণক্ষমতা মেনে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা দর্শনার্থীদের সমাগম যেন ঝরনাপারের জলাশয়, ছড়া, ঝোপঝাড় এবং নিশাচর প্রাণীর অন্ধকারের প্রয়োজনকে বিঘ্নিত না করে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। ব্যাঙের জন্য দূষণমুক্ত পানি, সাপের লুকানোর জায়গা, লজ্জাবতী বানরের নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার আর কীটপতঙ্গ ও পাখিদের জন্য খাদ্যগাছ রক্ষা করা আবশ্যক। দৃশ্যমান ঝরনাটির পাশাপাশি তার চারপাশের জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র ও বনভূমিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণ করা না হলে মাধবকুণ্ডের এই সমৃদ্ধ বন্য প্রাণভুবন ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।