বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও গভীর নিন্দা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক। গত রোববার প্রচারিত এক যৌথ বিবৃতিতে শিক্ষকেরা মন্তব্য করেন, এজাতীয় অপকর্ম কেবল একজন মহৎ কবির প্রতি অমর্যাদা নয়; এটি সমগ্র বাঙালির সাহিত্য, ঐতিহ্য, মুক্তচিন্তা এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের মূলে কুঠারাঘাত। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতা বাঙালির আত্মপরিচয় গঠন ও বিশ্বমানবতার বাণী প্রসারে চিরকাল ভূমিকা রেখে চলেছে এবং যুগ যুগ ধরে প্রজন্মকে মানবিক মর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা দিচ্ছে।
বিবৃতিতে শিক্ষকেরা স্পষ্ট করেন যে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যেকোনো ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা দর্শনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন এবং তা প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতাও রয়েছে। তবে এই মতভিন্নতা কখনোই মনীষীদের প্রতিকৃতি নষ্ট কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আঘাত হানার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সমীচীন নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক, সুস্থ সমালোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমেই তা প্রকাশ করা বিধেয়। তাঁরা আরও বলেন, এমন অপতৎপরতা চালিয়ে বিশ্বকবির মানবতাবাদী দর্শন বা সাহিত্যিক অবদানকে কখনো মুছে দেওয়া সম্ভব হবে না। এ ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতার জবাব সৃষ্টিশীল প্রয়াস, মননশীলতার চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েই দিতে হবে।
ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন প্রবেশদ্বারে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর সাম্প্রতিক নিন্দনীয় প্রসঙ্গটি টেনে বিবৃতিতে বলা হয়, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে জোরদার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের ভেতর সাংস্কৃতিক পরমতসহিষ্ণুতা ও মুক্তচিন্তার বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। এসব ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহ্য ও মুক্তবুদ্ধির সুরক্ষায় দেশের সকল প্রগতিশীল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন শিক্ষকেরা। উল্লেখ্য, বিশ্বকবির গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় আয়াসসহ চারজনকে আটক ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, অধ্যাপক সাদেকা হালিম, মো. রহমত উল্লাহ, সীতেশ চন্দ্র বাছার, মো. মশিউর রহমান, সাবিতা রিজওয়ানা রহমান, ফিরোজ আহমেদ, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, জেড এম পারভেজ সাজ্জাদ, মো. আব্দুর রহিম, এ কে এম খাদেমুল হক, এ এম আমজাদ এবং মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৬৩ জন শিক্ষক।