কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশের ফলে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। লেখালেখি ও চিত্রাঙ্কন থেকে শুরু করে কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি—নানা জটিল কাজ এখন যন্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব হচ্ছে। ফলে মানুষের চাকরি এআই কেড়ে নেবে কি না, এমন উদ্বেগও জোরালো হচ্ছে। তবে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের মতে, কাজের ক্ষেত্র ও ধরনে বড় পরিবর্তন এলেও মানুষের বিচারবুদ্ধি ও দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা এখনই শেষ হচ্ছে না। ২০২৫ সালের মার্চে ভারতের মুম্বাইয়ে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ আয়োজিত ‘এক্সপ্রেস আড্ডা’ অনুষ্ঠানে তিনি এমন তিনটি পেশার কথা তুলে ধরেন, যা এআই সহজে দখল করতে পারবে না। ক্ষেত্রগুলো হলো—সফটওয়্যার ডেভেলপার, জীববিজ্ঞানী ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, জটিল সমস্যার সমাধান, নতুন উদ্ভাবন এবং গভীরভাবে চিন্তা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বৈশিষ্ট্যের কারণেই এসব খাতে মানুষের প্রাধান্য বজায় থাকবে।
সফটওয়্যার নির্মাতাদের প্রসঙ্গে গেটস জানান, এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত কোড লেখা বা ভুল শনাক্ত করা সম্ভব হলেও এই পেশায় মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য থাকবে। কারণ কোনো সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে কেবল কোড লেখাই শেষ কথা নয়; উদ্ভূত সমস্যার ধরন বোঝা, উপযুক্ত সমাধান নির্ধারণ এবং বিভিন্ন অংশের সঠিক সমন্বয় ঘটানোর মতো বিষয়ে মানুষের তদারকি ও বুদ্ধিমত্তা জরুরি। পাশাপাশি স্বয়ং এআই প্রযুক্তির রূপরেখা তৈরি ও বিকাশেও ডেভেলপারদের ওপরই নির্ভর করতে হয়। ফলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের পরিকল্পনার জায়গাটি রয়েই যাবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে জীববিজ্ঞানের কথা বলেছেন গেটস। নতুন ওষুধ আবিষ্কার, রোগ শনাক্তকরণ বা ডিএনএ বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীদের বিপুল তথ্য যাচাইয়ে এআই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ অজানা কোনো রোগের উৎস অনুসন্ধান কিংবা মৌলিক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের জন্য নিছক ডেটা পর্যালোচনাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন তোলা, গবেষণার নকশা প্রণয়ন এবং ফলাফলের সৃজনশীল মূল্যায়ন। গেটসের ধারণা, গবেষণার এই উদ্ভাবনী ও চিন্তাশীল দিকটি এআই এখনো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি। ফলে জীববিজ্ঞানে এআই সহায়ক হিসেবে কাজ করলেও বিশেষজ্ঞদের স্থান পুরোদমে নেওয়া সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতের ওপর জোর দিয়েছেন গেটস। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ থেকে শুরু করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রচলিত ও বিকল্প জ্বালানির সমন্বয়ের পেছনে রয়েছে জটিল ব্যবস্থাপনা। কোনো দেশের সামগ্রিক জ্বালানিকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল হিসাব-নিকাশ করলেই চলে না; প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক বিপর্যয়ের সময় তড়িৎ ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ধরনের নিরাপত্তামূলক ও কৌশলগত কারণে এই খাতে মানুষের প্রয়োজনীয়তা অব্যাহত থাকবে। তবে গেটস সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর এই মন্তব্যের অর্থ এই নয় যে বাকি সব পেশা বিলুপ্ত হয়ে যাবে কিংবা উল্লেখিত তিনটি পেশার রূপান্তর ঘটবে না। বরং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এআইয়ের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের কোন দক্ষতাগুলো দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর থাকবে, তা-ই তিনি তুলে ধরেছেন।