‘আমার স্বামী আমার কাছে ছিলেন এক সুপারম্যান। অন্যরা তাঁকে কীভাবে দেখত জানি না, কিন্তু তিনি সব সময়ই আমার কাছে সুপারহিরো হয়ে থাকবেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাঁর স্মৃতি আমি ভুলতে পারব না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন আনন্দিতা সাংমা। গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান তাঁর স্বামী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি আইপি টেলিভিশন ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি এবং ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজের পরিচালক ছিলেন, যেখানে তিনি নানা অপরাধ ও অনিয়মের তথ্য এবং ভিডিও তুলে ধরতেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া আলিফ কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের সন্তান। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠা আলিফ দুর্গাপুরের গারো সম্প্রদায়ের নারী আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করে তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন, যদিও নিজ গ্রামেও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে একটি চায়ের দোকানের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় আলিফকে। চাচাশ্বশুর বিশু সাংমা বলেন, বাড়ির বাইরে বসে গল্প করার সময় বিকট শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা আলিফকে গুলিবিদ্ধ দেখেন। তিনি জানান, দুজন গুলি ছুড়ছিল এবং আরও দুজন পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল; আশপাশের লোকজন আসার আগেই আততায়ীর দল ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিহতের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকিরের দাবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা করার কারণেই তাঁর ভাইয়ের বহু শত্রু তৈরি হয়েছিল। তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি রুলি রেমা জানান, তাঁদের জামাতা অত্যন্ত অমায়িক মানুষ ছিলেন। পুরো গারো সম্প্রদায় তাঁকে ভালোবাসত এবং তিনিও তাঁদের ভীষণ আপন করে নিয়েছিলেন।
তেলনজিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চায়ের দোকানের সামনে জমে থাকা রক্ত তখনো শুকায়নি। সেখান থেকে সামান্য দূরে টিনের ঘরের সামনে দুই শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে বিলাপ করছিলেন আনন্দিতা সাংমা। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন মা শিলা রাংসা এবং দুই ফুফু নিরালা রেমা ও রুলি রেমা। স্মৃতিকাতর আনন্দিতা বলেন, বিয়ের পর থেকে একটি রাতও আলিফ তাঁকে ছাড়া থাকতে পারতেন না এবং নিজের হাতে তাঁকে খাইয়ে দিতেন। তাঁর সহযোগিতাতেই তিনি নার্সিং সম্পন্ন করেন এবং আলিফ তাঁর চাকরির চেষ্টাও করছিলেন। আনন্দিতা জানান, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে সেখানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। এখন দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে তিনি কীভাবে বাঁচবেন, সেই শঙ্কায় ভেঙে পড়ে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও ফাঁসি চান তিনি।
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকা শিলা রাংসা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্গাপুরে এর আগে সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর হত্যা, দুর্গাপুর বাজারে এক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা এবং কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আদিবাসী নেতা সুব্রত সাংমা হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। এবার তাঁর মেয়েজামাইকে নির্মমভাবে হত্যা করায় তিনি বিচারের আশা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। স্বজনেরা আরও জানান, গত বছরের ১০ নভেম্বরও সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেছিল দুর্বৃত্তরা। সে সময় তাঁর এক সহকর্মী এগিয়ে এলে তাঁকেও অস্ত্রের মুখে ধাওয়া করা হয়। ওই ঘটনায় আলিফের করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই এজাহারভুক্ত আসামি বর্তমানে জামিনে বাইরে রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান শনিবার সকাল সোয়া নয়টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর আগে শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের ময়নাতদন্ত শেষে কলমাকান্দার সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের শরীরে মোট ছয়টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বুকে (দুটি ভেদ করে চলে যায়, একটি পিঠে আটকে ছিল), একটি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং বাকি দুটির একটি মাথার তালুর চামড়া ও অন্যটি ডান কাঁধের চামড়া ভেদ করে। ক্ষতচিহ্ন দেখে তাঁর প্রাথমিক ধারণা, খুব কাছ থেকে সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে এই গুলিগুলো চালানো হয়েছে।