মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতি ক্রমেই বিস্তৃত হওয়া এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তার ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর বেড়ে গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল রপ্তানি পরিকাঠামোয় আক্রমণ অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক সরবরাহ–সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে উন্নীত হয়, যা লেনদেনের একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর আগে মে মাসের ১৯ তারিখে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ছিল ১১১ দশমিক ২৮ ডলার, যার পর এবারই প্রথম জ্বালানিটির দাম এতটা বাড়ল। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৪১ ডলারে; এক মাসের ব্যবধানে এই তেলটির দাম প্রথমবারের মতো একশ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তেলের দর দ্রুত চড়লেও এপ্রিল মাসে হওয়া অস্ত্রবিরতির খবরে তা নিম্নমুখী হতে থাকে। রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দর ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে অবস্থান করলেও জুনের শেষ নাগাদ তা ৭৩ ডলারে নেমে এসেছিল। তবে জুলাই মাস থেকে নতুন করে ভূরাজনৈতিক সংঘাত দানা বাঁধায় সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তেলের মূল্য পুনরায় উর্ধ্বমুখী হয়ে গতকাল ব্রেন্ট ফিউচারসের দর ১১০ ডলারে পৌঁছে যায়।
হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের সাহায্যে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল এনে বিকল্প পথে রপ্তানি চালু রেখেছে। অন্যতম প্রধান এই তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রটিতে শুক্রবার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর চেষ্টা করা হলে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তা প্রতিহত করার দাবি করে। জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক শ্রেইনার পার্কার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে উল্লেখ করেন, হরমুজের অস্থিরতার কারণে বিপুল পরিমাণ তেল বর্তমানে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পাঠানো হচ্ছে; তাই সেখানে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার শঙ্কা বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রমকারী বিভিন্ন জাহাজে ইরানের আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি তেহরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবে তৎপরতা জোরদার করেছে এবং সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল প্রতিষ্ঠান আরামকোর সদর দপ্তরেও আঘাত হেনেছে। সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন এবং যুদ্ধঝুঁকি বাবদ বিমার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তেল উৎপাদন চালু থাকলেও প্রধান রপ্তানি করিডোরগুলো অনিরাপদ হয়ে ওঠায় প্রকৃত উৎপাদনঘাটতি দেখা দেওয়ার আগেই বাজারে সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা ও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।