দেশের বাজারে অবৈধ মুঠোফোন সেটের ব্যবহার বন্ধ করতে তৃতীয়বারের মতো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারের নীতিগত অবস্থান হলো, বৈধ হ্যান্ডসেটের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে না এনে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে না। কেন্দ্রীয় এই তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বর যাচাই করে নেটওয়ার্ক থেকে চুরি হওয়া বা অননুমোদিত হ্যান্ডসেট নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই ধাপে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে বৈধ উপায়ে দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত ফোনসেটগুলো শনাক্ত করা হবে, তবে সে সময় নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা বা ডি-রেজিস্ট্রেশন রাখা হবে না। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে সর্বশেষ বা প্রকৃত মালিকের ব্যবহার নিশ্চিতে ডি-রেজিস্ট্রেশন সেবা চালু করা হবে। এর আগে অনানুষ্ঠানিক ফোনের কারণে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর বিষয়টি উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর বিটিআরসিকে পদক্ষেপ নিতে চিঠি পাঠিয়েছিল এনবিআর। যার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ অনুমোদন দেয় এবং একই বছরের ১ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলক চালুর পর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি স্বয়ংক্রিয় বন্ধের সুবিধাসহ ব্যবস্থাটি কার্যকরের কথা থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে কঠোর ফিচারগুলো স্থগিত রাখা হয়েছিল।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ৯ জুন অর্থনৈতিক ও জননিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিটিআরসিকে বার্তা দেয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২ জুলাই এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পৃথক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা হয়। ওই বৈঠকেই ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে এনইআইআর চালুর তৃতীয় দফার এই প্রস্তাব আসে। বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সম্মতির জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বিটিআরসি। তবে সরকার সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া তড়িঘড়ি কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়।
এ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ করা জরুরি হলেও ক্রেতাসাধারণের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা হচ্ছে। বৈধ ফোনের দাম সহনীয় রাখা গেলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যথায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে স্থানীয় কারখানায় মূলত নিম্ন ও মাঝারি বাজেটের ফোন সংযোজিত হলেও বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ, জটিল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সীমিত চাহিদার কারণে অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির মতো ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম মডেল বাণিজ্যিকভাবে তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। দামের ব্যবধান কমাতে চলতি বছরের শুরুতে আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হলেও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের দাম বাড়ার অজুহাতে আগেই সেটপ্রতি ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরুতে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া স্মার্টফোনের দাম সেপ্টেম্বরে বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে এবং বছর শেষে সর্বনিম্ন মডেলের দামও ২৫ হাজার টাকায় ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক মেমোরি চিপের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন খরচ ও দাম বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন এক্সেল টেলিকমের (স্যামসাং) নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন টিপু। অন্যদিকে বৈধ প্রস্তুতকারকদের তথ্যমতে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া আনঅফিশিয়াল ফোনের অন্তত ৭৫ শতাংশই মূলত রিফার্বিশড ও ব্যবহৃত ফোন, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীদের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, বিভিন্ন দেশ শুল্ক কমিয়ে ফোনের দাম নাগালের মধ্যে রেখেছে। ক্যামেরা, ডিসপ্লে ও ব্যাটারির মতো যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমাতে পারলে স্থানীয়ভাবে তৈরি ফোনের দাম কমবে; অন্যথায় দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে এনইআইআর বাস্তবায়ন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।