নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়—মোট ২২৬ কিলোমিটারের চ্যালেঞ্জিং পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান সম্পন্নকারী প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন সাজিয়া সুলতানা। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আইসিবির জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার সাজিয়া গত ৪ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার গুর্যে কাউন্টিতে ১৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে এই আসর শেষ করেন। এর ঠিক তিন সপ্তাহ আগে, ১২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের নিসে আয়োজিত ৭০.৩ আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ফিনিশ লাইন অতিক্রমের অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি। সজীব মিয়ার কাছে নিজের এই অনুপ্রেরণাদায়ী লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে সাজিয়া জানান, সাইকেল চালানোর সময় ৪০ কিলোমিটারের মাথায় অসমান ও সংকীর্ণ রাস্তায় তাঁর সামনের চাকা পিছলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে তাঁর বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ভেঙে যায়, মাথা, হাঁটু ও হাতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। রক্তক্ষরণ দেখে এক স্বেচ্ছাসেবক কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানালেও সাজিয়া লড়াই ছাড়েননি; প্রাথমিক শুশ্রূষা নিয়েই আবার ট্র্যাকে নেমে ফিনিশ লাইনে পৌঁছান। নিসের উত্তাল ভূমধ্যসাগরে সাঁতার ও ৪ হাজার ৯০ ফুট উঁচু খাড়া পাহাড়ি পথ কিংবা কোরিয়ার বরফশীতল জলে সাঁতার শেষে ক্লান্ত দেহে পুরো ম্যারাথন দৌড়ানো—প্রতিটি ধাপই ছিল চরম পরীক্ষা। গত ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়রনম্যান ৭০.৩ সমাপ্ত করে তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।
ক্রীড়াজগতে তাঁর আগমন ঘটে হঠাৎ করেই। অফিসের ছেলেদের ক্রিকেট ও ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবে যুক্ত থাকার পর সহকর্মী ফারুকের অনুপ্রেরণায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে খেলাধুলায় অংশ নেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাঁতার ও সাইক্লিংয়ের অনুশীলন শুরু করে ২০২৬ সালের জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় সপ্তম স্থান লাভ করেন। মা-বাবা ও স্বামীর পূর্ণ সমর্থনে সংসার ও আইসিবির দায়িত্ব সামলে ভোরে ছয়টা থেকে আটটা এবং অফিস শেষে ফিরে রাতে আরও দুই ঘণ্টা ইনডোর ট্রেনিং করতেন তিনি, যাতে কখনো আনন্দ নিয়ে যুক্ত হতো তাঁর দুই সন্তানও। ৪০–৪৪ বছর বয়স শ্রেণিতে প্রতিযোগিতা করা সাজিয়া মনে করেন বয়স কোনো বাধা নয়, বরং দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় পরিপক্বতা ও শৃঙ্খলা বড় শক্তি। তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আয়রনম্যানের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করা, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাট হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করা এবং দেশের নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতায় উদ্বুদ্ধ করা।