স্বাভাবিক নিয়মে একটি শিশুর বাকস্ফুট হতে বাবা-মাকে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। তবে মহান আল্লাহ তাঁর অপার কুদরতে এমন কিছু শিশুকে শৈশবেই কথা বলার ক্ষমতা দান করেছিলেন, যাদের বয়স তখন স্বাভাবিকভাবে কথা বলার মতো ছিল না। ইতিহাসের পাতায় এমন চারজন অলৌকিক শিশুর বিবরণ বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমজন হলেন মরিয়ম-তনয় হজরত ইসা (আ.)। পিতার মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর অসীম ক্ষমতায় তাঁর জন্ম হয়। নবজাতক ইসাকে নিয়ে যখন মা মরিয়ম লোকালয়ে ফেরেন, তখন তাঁকে কঠোর অপবাদ ও তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়। পিতা ছাড়া সন্তানের জন্মের বিষয়ে লোকজন কৈফিয়ত চাইলে মরিয়ম (আ.) কোনো কথা না বলে শিশুটির দিকে ইঙ্গিত করেন। তখন বিস্মিত জনতা প্রশ্ন তোলে, ‘দোলনার শিশুর সঙ্গে আমরা কীভাবে কথা বলব?’ ঠিক সেই মুহূর্তেই আল্লাহর হুকুমে নবজাতক ইসা কথা বলে ওঠেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, আল্লাহ তাঁকে বরকতময় করেছেন এবং আজীবন নামাজ ও জাকাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। সদ্যোজাত এক শিশুর এই সুস্পষ্ট বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে হতবাক করে দেয় এবং মা মরিয়মের পবিত্রতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৯–৩৩)
দ্বিতীয় ঘটনাটি হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের এক কঠিন পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। আজিজের স্ত্রী জুলাইখা তাঁকে অসৎ কাজে লিপ্ত করতে ব্যর্থ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়। ইউসুফ (আ.) নিজেকে বাঁচাতে ঘর থেকে বের হতে গেলে জুলাইখা পেছন দিক থেকে তাঁর জামা টেনে ধরে ছিঁড়ে ফেলে। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রকাশ পেলে জুলাইখার পরিবারেরই এক সদস্য একটি বিচক্ষণ মীমাংসা দেয়। সে বলে, ইউসুফের পরিহিত জামা যদি সামনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে, তবে জুলাইখা সত্যবাদী এবং ইউসুফ মিথ্যাবাদী। আর যদি জামাটি পেছন দিক থেকে ছেঁড়া পাওয়া যায়, তবে প্রমাণিত হবে যে জুলাইখা মিথ্যা বলেছে এবং ইউসুফ সত্যবাদী। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৬–২৭)। তদন্তে দেখা যায় জামার পেছনের অংশটিই ছেঁড়া ছিল, যা ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষিতা প্রমাণ করে। তাফসির বিশারদদের মতে, এই যুক্তি তুলে ধরা ব্যক্তিটি ছিল পরিবারের এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। (ইবনে জারির তাবারি, তাফসির আত–তাবারি, ১৬/৫৩-৫৬, মাকতাবাতু ইবনি তাইমিয়াহ, কায়রো)।
তৃতীয় শিশুটির মাধ্যমে সত্য প্রকাশিত হয়েছিল বনি ইসরাইলের প্রখ্যাত ইবাদতগুজার ব্যক্তি জুরাইজের ঘটনায়। এক নারী তাঁকে অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ করতে না পেরে এক রাখালের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং একটি সন্তান জন্ম দেয়। পরে সে অপবাদ রটায় যে জুরাইজই এই শিশুর পিতা। ক্ষুব্ধ জনতা জুরাইজের ইবাদতখানা ভেঙে দিলে তিনি অজু ও নামাজ শেষ করে নবজাতকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তোমার বাবা কে?’ আল্লাহর কুদরতে শিশুটি তখন স্পষ্ট বাক্যে উত্তর দেয়, ‘রাখাল।’ এভাবে এক অবোধ শিশুর সাক্ষ্যে জুরাইজের ওপর থেকে কলঙ্কের বোঝা নেমে যায় এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষা পায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৬)।
চতুর্থ ঘটনাটি ঘটেছিল ফেরাউনের প্রাসাদে। ফেরাউন-কন্যার এক বিশ্বস্ত কেশবিন্যাসকারী পরিচারিকা একদিন কাজ করার সময় চিরুনি পড়ে গেলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তা তুলে নেন। এতে ফেরাউন-কন্যা জানতে চায় সে তার পিতার নাম নিচ্ছে কি না। ওই সেবিকা নির্ভয়ে ঘোষণা করেন, আল্লাহই তাঁর ও ফেরাউনের একমাত্র প্রতিপালক। সংবাদটি পেয়ে ক্ষিপ্ত ফেরাউন তাঁকে ইমান ত্যাগের নির্দেশ দেয় এবং ব্যর্থ হয়ে সেবিকা ও তাঁর সন্তানদের উত্তপ্ত তামার পাত্রে নিক্ষেপের আদেশ দেয়। একে একে বড় সন্তানদের আগুনে নিক্ষেপের পর যখন কোলের দুধের শিশুর পালা আসে, তখন মায়ের মনে স্বভাবসুলভ দ্বিধা সৃষ্টি হয়। সেই মুহূর্তে আল্লাহর হুকুমে শিশুটি মাকে অভয় দিয়ে বলে ওঠে, ‘মা, ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই তুমি সত্যের ওপর আছ।’ এই অলৌকিক বার্তায় মা অবিচল থাকেন এবং সত্যের তরে প্রাণ উৎসর্গ করেন। (আল-হাকেম, আল-মুসতাদরাক আলাস-সহিহাইন, হাদিস: ৩৮৮১)।
দোলনায় কথা বলা এই শিশুদের অলৌকিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কুদরত মানবীয় ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি সত্যের বিজয় ও নির্দোষকে কলঙ্কমুক্ত করতে যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। তাই বিপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা প্রতিটি মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। —নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক (nahidasultana753375@gmail.com)