পারিবারিক ঐতিহ্য, রাজপথের সংগ্রাম ও মেয়র নির্বাচনের দৌড় দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে অবস্থান তৈরি করেছিলেন ইশরাক হোসেন। প্রথম দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর আসন পাওয়া তাঁর ক্যারিয়ারে এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত আট মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা ছাড়তে হচ্ছে ৩৯ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদকে। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র উঁচিয়ে চালানো সেই অভিযানের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এরপরই আজ সকালে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় ইশরাক জানান যে তিনি দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে ১৮ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার বা বাহাদুরি প্রদর্শনের বিপরীতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সংযত আচরণের বিষয়ে জনমনে গভীর প্রত্যাশা তৈরি হয়। সরকারের এই মেয়াদে শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে গত মাসেই মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার জেরে দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃঢ় মনোভাব প্রকাশ পেল, যা ক্ষমতাসীন দলের অন্যান্য নেতাকর্মী ও মন্ত্রীদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর ভর করেই রাজনীতিতে পা রাখেন তাঁর ছেলে ইশরাক। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার প্রয়াণের পর তিনি পুরান ঢাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিদেশে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই ব্যবসায়ী ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হন এবং ঢাকা দক্ষিণের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
এর আগেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একাধিকবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে হারের পর তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করে এবং নির্বাচন কমিশন গেজেট জারি করে। কিন্তু তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শপথ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মেয়রের দায়িত্ব নিশ্চিত করার দাবিতে ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁর সমর্থকেরা নগর ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করলে নাগরিক সেবা মারাত্মক বিঘ্নিত হয়। সে সময় ইশরাক নিজেও সেখানে গিয়ে নিজ উদ্যোগে শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুমকি দেন। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও ভোটাধিকার রক্ষার যুক্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়রের দায়িত্ব পাননি, উল্টো জনদুর্ভোগ সৃষ্টি ও অপরিণামদর্শিতার কারণে দলের ভেতরে-বাইরে সমালোচিত হন।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি বেশ কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার মুখোমুখি হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি ছিলেন। সেখানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আপত্তি তুলে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে চান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বদলে ক্ষুব্ধ হয়ে ইশরাক বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ এতে হট্টগোল বাড়লে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও এনসিপি নেতা আখতার হোসেন সবাইকে শান্ত করেন। এছাড়া গত জুলাইয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি ইশরাকও সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে ট্রলের শিকার হন। তখন ফেসবুকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি লিখেছিলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা উঠলে শ্রদ্ধায় আমার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুটে উঠে যায়। আমার হাত দিয়ে আমি বীর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট দিয়েছি। হাত আমার, সম্মান জানিয়েছি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বীরদের। দেশ আমার গণতান্ত্রিক; আমার ইচ্ছায় আমি স্যালুট দিয়েছি। যতবার ইচ্ছা হবে, যখন ইচ্ছা হবে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট জানাব।’
বিশ্লেষকদের মতে, গেন্ডারিয়ার মাদকবিরোধী অভিযানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো আচরণ এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের অতিরিক্ত প্রবণতাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা, হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।’ তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকলেও মন্ত্রিত্ব হারানোর এই ঘটনা দলীয় পরিচয় বা পারিবারিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের জবাবদিহিতার নীতিকেই তুলে ধরছে। একই সাথে গেন্ডারিয়ার ওই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও সার্বিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ তদন্তের দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহলে।