‘হাওর, জঙ্গল, মহিষের শিং—এই তিনে মৈমিনসিং’—ব্রিটিশ আমলের সুবিশাল ময়মনসিংহের প্রাকৃতিক রূপ নিয়ে প্রচলিত এই লোকপ্রবাদ আজ আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নয়। কালের বিবর্তনে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের এই ঐতিহাসিক জনপদটি এখন আর কেবল জেলা শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিব্যবস্থা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রধান প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাশয় ভরাট এবং নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ শহরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সুদূরপ্রসারী ভাবনার দাবি জানাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রণীত ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা। আইনটির লক্ষ্য ময়মনসিংহের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে আধুনিক, দুর্যোগসহনশীল, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটনবান্ধব সুপরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। এ বিষয়ক অভিজ্ঞতা বা নাগরিক সংবাদ পাঠাতে পাঠকদের ns@prothomalo.com ঠিকানায় যোগাযোগ করার সুযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের বর্তমান জনসংখ্যা ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৭২২ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব প্রায় ৬ হাজার ৩১৫ জন। পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজনে মানুষের প্রতিনিয়ত আগমনের ফলে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন রূপ পাওয়া ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মউক) দায়িত্ব কেবল ভবনের নকশা ছাড় করাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মউকের চেয়ারম্যান ভবনের নকশা অনুমোদনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ তদারকির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সংস্থাটির জন্য নিজস্ব কার্যালয় ও পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি, কারণ বর্তমানে জেলা গণপূর্ত ভবনের একটিমাত্র কক্ষ থেকে এর প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শহরের অন্যতম প্রধান ভোগান্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে রেকর্ড ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর প্রধান সড়কগুলোয় হাঁটুপানি জমে যায় এবং তা নিষ্কাশন হতে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। এর আগে ২০২৫ সালে নগরীর বলাশপুর এলাকায় প্রায় ২ হাজার পরিবারের মৌসুমি জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তির চিত্র সামনে আসে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, ড্রেনের অভাব এবং বর্জ্য ফেলার কারণে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেবল বিচ্ছিন্ন ড্রেন তৈরি না করে জলাধার সংরক্ষণ, পরিকল্পিত খাল এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পুকুর বা রিটেনশন পন্ডসহ সামগ্রিক জলপ্রবাহভিত্তিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণই এর টেকসই সমাধান হতে পারে।
পুরোনো শহরের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ব্রহ্মপুত্র নদের অপর প্রান্তে আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্মুক্ত খেলার মাঠ, বিনোদন পার্ক, সাইকেল লেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল অবকাঠামোসমৃদ্ধ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক উপশহর গড়ে তোলা যেতে পারে। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের স্ট্রাকচার ও অ্যাকশন প্ল্যান এবং ২০১১-২০৩১ সালের স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের গবেষণা পর্যালোচনার পাশাপাশি জিআইএস ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সহায়তায় ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়কে মাথায় রেখে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নির্ধারণ করা দরকার। একই সঙ্গে পুরো নগরীকে এককেন্দ্রিক না রেখে বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য কিংবা বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি ‘পলিসেন্ট্রিক’ বা বহুকেন্দ্রিক নগর মডেলে রূপ দেওয়া সম্ভব, যা শহরের বর্তমান মারাত্মক অটোরিকশার যানজট নিয়ন্ত্রণে আনবে।
সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শহর ও উপশহরের মধ্যে একটি ইন্টিগ্রেটেড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক (আইপিটিএন) গড়ে তোলা প্রয়োজন, যার মধ্যে নির্দিষ্ট বাস রুট, বিআরটি করিডর, রেল ও নৌপথের আন্তসংযোগ এবং নির্দিষ্ট পার্কিং হাব থাকবে। কৃষিভিত্তিক অঞ্চল হওয়ায় নতুন ল্যান্ড ইউজ জোনিং ম্যাপের মাধ্যমে কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরে পরিবেশ ও প্লাবনভূমি রক্ষা করে একটি সমন্বিত ‘রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ প্রণয়নের মাধ্যমে ‘রিভার সিটি’র ধারণা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আইনে উল্লিখিত দিকনির্দেশনা মেনে নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও বস্তিবাসীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘মিক্সড ইনকাম হাউজিং’ বা মিশ্র আয়ের আবাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক।
আধুনিক ময়মনসিংহকে সত্যিকারের স্মার্ট নগরী করতে একটি সমন্বিত আরবান ডেটা সেন্টার (ইউডিসি) থাকা প্রয়োজন, যা জিআইএসভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, প্রকৌশলী, স্থপতি, চিকিৎসক ও সমাজের নানা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘আরবান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ফোরাম’ গঠন করা যেতে পারে। বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভরতা পরিহার করে ২০২৬-২০৫০ সালের জন্য একটি ২৫ বছর মেয়াদি রূপরেখা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এর মধ্যে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে তথ্য সংগ্রহ, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান ও উপশহরের স্থান নির্ধারণ; ২০৩০-২০৪০ মেয়াদে মূল অবকাঠামো, আবাসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন; এবং ২০৪০-২০৫০ মেয়াদে ময়মনসিংহকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর বহুকেন্দ্রিক সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নিশ্চিত করতে হবে।