কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর মূলত একটি আপৎকালীন জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতি। সাধারণত কোনো ব্যক্তির হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অর্থাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে দ্রুত সিপিআর প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সময়, খেলার মাঠে কিংবা যেকোনো স্থানে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ব্যক্তিও আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হতে পারেন, যা তাৎক্ষণিক অচেতন হওয়া বা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ক্রিকেটার তামিম ইকবালের জীবনও এই সিপিআরের মাধ্যমেই রক্ষা পেয়েছিল, যার ফলে বিষয়টি জানা সবার জন্যই জরুরি।
কোনো ব্যক্তি হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাঁর ঘাড়ে হাত দিয়ে ক্যারোটিড পালস বা নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করতে হবে। স্পন্দন না পাওয়া গেলে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত। এ সময় রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস সম্পূর্ণ বন্ধ কিংবা অস্বাভাবিক হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিলম্ব না করে কালক্ষেপণ ছাড়াই সিপিআর শুরু করতে হবে।
সিপিআরের প্রথম ধাপ হিসেবে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিরাপদ কি না তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এরপর রোগীকে সজোরে ডেকে তাঁর চেতনা আছে কি না, শ্বাস নিচ্ছেন কি না এবং ক্যারোটিড পালস রয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগীর কোনো সাড়া ও নাড়ির স্পন্দন না থাকলে অবিলম্বে সিপিআর আরম্ভ করতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি সেবা কেন্দ্রে ফোন করে সাহায্য চাইতে হবে, যার জন্য সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ড সময় ব্যয় করা যাবে; কেননা কেবল সিপিআর দিয়ে কাউকে দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখা যায় না।
সিপিআর প্রয়োগের নিয়ম হলো, রোগীর বুকের মাঝবরাবর এক হাতের তালুর ওপর অপর হাত রেখে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার গতিতে সজোরে চাপ (চেস্ট কম্প্রেশন) দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চাপের গভীরতা হতে হবে প্রায় ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি)। প্রাপ্তবয়স্কদের বুকে প্রতি ৩০ বার চাপ দেওয়ার পর রোগীর নাক চেপে ধরে মুখের মাধ্যমে দুইবার কৃত্রিম শ্বাস দিতে হবে, যাতে তাঁর বুক ওঠানামা করে।
শিশুদের ক্ষেত্রে সিপিআরের অনুপাত হবে ১৫:২। অতি অল্পবয়সী বা ছোট শিশুদের বুকে চাপ দিতে হয় দুটি আঙুল ব্যবহার করে এবং শ্বাস দেওয়ার সময় মুখ ও নাক একসঙ্গে ঢেকে রাখতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ার মাঝে প্রতি ২ মিনিট পরপর রোগীর ক্যারোটিড পালস যাচাই করতে হবে।
ঘটনাস্থল বা আশপাশে এইডি যন্ত্র (বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ ফেরাতে সহায়তা করে) পাওয়া গেলে দ্রুত তা রোগীর বুকে সংযুক্ত করতে হবে। সাধারণত উড়োজাহাজ, বিমানবন্দর কিংবা মেট্রোস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে এটি থাকে। যন্ত্রটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট নির্দেশাবলি মেনে চলতে হয়। রোগীর রক্ত সঞ্চালন বা ক্যারোটিড পালস স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অথবা হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা না করা অবধি একটানা সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে।
অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তি সঠিকভাবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন না। তাই বারডেম হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের মতে, চিকিৎসক, নার্স, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, উদ্ধারকারী ও ডুবুরিসহ দেশের সব শিক্ষিত নাগরিকেরই সিপিআর প্রশিক্ষণ থাকা বাঞ্ছনীয়। উন্নত বিশ্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে এটি অন্তর্ভুক্ত থাকায় সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে দক্ষ করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।