পবিপ্রবিতে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়াই কর্মকর্তা থেকে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের প্রক্রিয়া, ইউজিসির নীতিমালা উপেক্ষার অভিযোগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) তিন কর্মকর্তাকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিন্ন নীতিমালার শর্তাবলি মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিজস্ব নিয়োগবিধি মেনেই এই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ অক্টোবর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ এবং ২৫ অক্টোবর কৃষিতত্ত্ব ও মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদের নিয়োগ বাছাই বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আবেদনকারী তিন কর্মকর্তার মধ্যে দুজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ এবং অপরজন বর্তমান রেজিস্ট্রারের স্ত্রী বলে জানা গেছে। ২০২১ সালে প্রণীত ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক পদে সরাসরি নিয়োগ পেতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্যায়ে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫ থাকতে হয়। পাশাপাশি পিএইচডিধারীদের ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর এবং এমফিল ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে দুই ও তিন বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া স্বীকৃত জার্নালে ন্যূনতম তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশের শর্ত রয়েছে, যার অন্তত একটিতে প্রার্থীকে প্রথম লেখক হতে হবে। তবে পবিপ্রবির গত ২২ জুন ও ১৬ আগস্ট প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সিজিপিএ চাওয়া হয়েছে ৩ এবং পিএইচডিধারীদের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব বিধিতে প্রকাশনায় প্রথম লেখক হওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পছন্দের কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দিতেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।
প্রার্থীদের মধ্যে জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রাহাত মাহ্মুদ কৃষিতত্ত্ব বিভাগে আবেদন করেছেন। ২০০৭ সালে সহকারী খামার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দিয়ে বর্তমানে উপ-খামার তত্ত্বাবধায়ক পদে থাকা এই কর্মকর্তার স্নাতকে সিজিপিএ ৩.২৭ (যা ইউজিসির নীতিমালার চেয়ে কম) এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর নেই। অন্যদিকে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রার্থী ডেপুটি রেজিস্ট্রার জিনাত নাসরিন সুলতানা বর্তমান রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. জামাল হোসেনের স্ত্রী। এছাড়া মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রার্থী হয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও অফিস অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাচিব মোহাম্মদ তুষার, যাঁর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ২০০৭ সালে সেকশন অফিসার হিসেবে যোগ দেওয়া এই তিন কর্মকর্তার কারও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নেই। রাহাত ও জিনাত বাছাই বোর্ডের কার্ড পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তুষার জানান তিনি এখনো কার্ড পাননি।
বিভাগীয় প্রধানদের মধ্যে কৃষিতত্ত্বের চেয়ারম্যান গোপাল সাহা ইউজিসির বিধান অনুসরণের তাগিদ দিলেও উদ্ভিদ রোগতত্ত্বের চেয়ারম্যান মো. রুবেল মাহমুদের মতে, পিএইচডি থাকলে যে কাউকেই সহকারী অধ্যাপক করা যায়। তবে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন নিয়োগবিধির খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। এদিকে উপাচার্য অধ্যাপক হেমায়েত জাহান বলেন, ইউজিসির ইউনিফাইড রুল সব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো গ্রহণ করেনি, ভবিষ্যতে পবিপ্রবিও হয়তো তা গ্রহণ করবে। সহ–উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম সাইফুল ইসলাম জানান, প্রার্থীরা কর্মকর্তা হিসেবে নয়, পিএইচডিধারী হিসেবে বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী আবেদন করে কার্ড পেয়েছেন। রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. জামাল হোসেন ৮ অক্টোবর দাবি করেন, নিজস্ব বিধিমালায় পিএইচডি ও প্রকাশনা থাকলে নিয়োগে বাধা নেই এবং তিনি বাছাই বোর্ডের সদস্য নন।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ৮ অক্টোবর স্পষ্ট জানান, কর্মকর্তা থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে যাওয়ার কোনো নিয়ম নেই এবং বিষয়টি কমিশনের নজরে এলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ থেকেও নীতিমালা লঙ্ঘনে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইউজিসির সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, সহকারী অধ্যাপক হতে পাঠদানের অভিজ্ঞতা আবশ্যক। এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে ইউজিসির কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।





আপনার মতামত লিখুন