ইনানীর রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু: পর্যটন খাতে তদারকিহীনতার চড়া মাশুল
কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের খুঁজছেন এক পর্যটক। আজ সকালে
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে শুষ্ক মৌসুম শুরু হতে না হতেই ফের অগ্নিকাণ্ডের ভয়াল রূপ দেখল দেশ। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর মেরিন ড্রাইভ–সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ‘টুপ টুপ’ নামের একটি রিসোর্টে আগুনে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে একই পরিবারের সদস্য ছিলেন ছয়জন। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ শেষে যাঁদের অনেকের ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি ছিল, তাঁদের সেই আনন্দযাত্রা রূপ নিয়েছে বিষাদময় মৃত্যুতে। নিত্যদিনের সড়ক দুর্ঘটনা বা সাগরে ডোবার মতো ঘটনা ছাড়াও দেশের বাইরে ভূমধ্যসাগরে সলিলসমাধি, ইউক্রেনের যুদ্ধে ড্রোন হামলা, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কিংবা গত আগস্টে কলকাতার হোটেলে আগুনে পুড়ে ৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তালিকায় এবার যুক্ত হলো ইনানীর এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি।
কক্সবাজারের পর্যটন ইতিহাসে বিরল এই বিপর্যয় পর্যটন খাতের নিরাপত্তাহীনতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, খালের ওপর গড়ে ওঠা এবং অতীতে নেতিবাচক পর্যালোচনায় থাকা এই স্থাপনাটি মূলত পাঁচ-ছয় বছর আগের বেগুনবাড়ির বস্তিসদৃশ কাঠের ঘর থেকে লাল টিন, ছন আর অ্যাঙ্গেল জুড়ে দিয়ে ‘রেট্রোফিটিং’ বা এস্থেটিক রূপ ধারণ করেছিল। নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কাঠের তৈরি মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ি দিয়ে থাকার কক্ষ করা হয়েছিল। ফলে নিচে আগুন লাগার পর একমাত্র যাতায়াতপথটি কাঠের সিঁড়িসহ পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায় এবং বিকল্প কোনো নির্গমনপথ না থাকায় অতিথিরা ওপরেই আটকা পড়েন। এমনকি শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েও শেষরক্ষা হয়নি অনেকের; সেখান থেকেই তাঁদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
এই সংকট শুধু কক্সবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; কাপ্তাই হ্রদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনার সুন্দরবন কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউসবোটগুলোতেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাহাড়ের অধিকাংশ রিসোর্টই জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর বা ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। অথচ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩.০২ শতাংশ অবদান রাখা ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল শিল্প অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। যেখানে সদিচ্ছাসম্পন্ন উদ্যোক্তারা নিয়মমাফিক কাজ করতে গিয়ে টেবিলে টেবিলে ভোগান্তির শিকার হন, সেখানে অনুমোদন ছাড়াই বহু অবৈধ প্রতিষ্ঠান রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পুরোনো সেই দায়সারা বয়ানই প্রকাশ্যে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, গত জুনেই রিসোর্টটি পরিদর্শন করে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা তোয়াক্কা না করেই রিসোর্টটি সচল রাখা হয়। সংস্থার চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসের মধ্যে কাঠের কাঠামোয় আগুন দ্রুত ছড়ালেও সেখানে অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার, অ্যালার্ম, হোসপাইপ বা ফায়ার সেফটি প্ল্যান কিছুই ছিল না; এমনকি তাদের ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, অনুমতিহীনভাবে কার্যক্রম চালানোয় গত এপ্রিলে নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে।
তবে পরিবেশ আইনে কেবল নোটিশ ও জরিমানা করার সুযোগ থাকলেও উচ্ছেদ কিংবা সিলগালা করার একমাত্র আইনি এখতিয়ার রয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা কিংবা বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার—কোনোটিই এই রিসোর্টের ছিল না। তদারকি সংস্থাগুলোর মতে, এসব ক্ষেত্রে প্রায়শই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়, বিশেষ করে যখন পেশাদারির বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে নিয়োগ হয়। ১০টি তরতাজা প্রাণ হারানোর পর দায় এড়াতে হাল আমলের ‘ভিকটিম ব্লেমিং’য়ের সুরে হয়তো বলা হতে পারে পর্যটকেরা কেন সেখানে গেলেন, কিন্তু তদারকির চরম অবহেলা ও লোভের ফাঁদ বন্ধ না হলে পর্যটকদের এমন আত্মাহুতি কোনোদিনই থামবে না। (লেখক: রাফসান গালিব, সম্পাদকীয় সহকারী, প্রথম আলো; ই-মেইল: galibrafsan1990@gmail.com; মতামত লেখকের নিজস্ব।)





আপনার মতামত লিখুন