ছবি ১৪: শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণ। ১৯২৫ সালে আবিষ্কৃত এই সমীকরণটি পুরো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। সমীকরণের ত্রিশূলের মতো দেখতে ψ চিহ্নটিকে বলা হয় সাই। একে বলা হয় ওয়েভফাংশন। এটি আসলে কোনো দৃশ্যমান তরঙ্গ নয়; এটি নির্দেশ করে কোনো মুহূর্তে একটি অতিপারমাণবিক কণা (যেমন ইলেকট্রন) মহাশূন্যের কোথায় থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি!
পরমাণুর স্থায়িত্ব কিংবা হাইড্রোজেন পরমাণুর নির্দিষ্ট বর্ণের আলো শোষণ ও নিঃসরণের রহস্য বোরের পরমাণু মডেল চমৎকারভাবে সমাধান করলেও তা সার্বজনীন হতে পারেনি। পর্যায় সারণির অন্যান্য মৌলগুলোর আলো গ্রহণ ও বিকিরণের আচরণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মডেলটি সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়। ফলে বিশ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন যে অতিক্ষুদ্র জগতের ক্ষেত্রে সনাতন পদার্থবিজ্ঞান আর কাজ করছে না। প্রায় এক শতাব্দী আগে আজকের সুপরিচিত কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হওয়ার পেছনে অদ্ভুত এক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল মানুষের চুলের প্রস্থের সমান কাঁটাযুক্ত অতিসাধারণ এক পরাগরেণু।
১৯২৫ সালের গ্রীষ্মকালে জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ পরাগরেণুর সংক্রমণে তীব্র হে ফিভার ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হন। চোখ-মুখ ফুলে এতটাই বিকৃত হয়েছিল যে তাঁর বাড়িওয়ালি ভেবেছিলেন তিনি কারও সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়েছেন। অস্বস্তিকর শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ২৩ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী অ্যাসপিরিন থেকে শুরু করে তখনকার চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত কোকেন পর্যন্ত গ্রহণ করেন। শেষমেশ কোনো উপশম না পেয়ে নিস্তার পেতে তিনি পাড়ি জমান জার্মানির উপকূলবর্তী উদ্ভিদহীন হেলিগোল্যান্ড দ্বীপে। সেই নির্জন স্থানে তিনি ইলেকট্রনের চিরায়ত অবিচ্ছিন্ন গতিপথের ধারণা বাতিল করে পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্য, বিশেষত ইলেকট্রনের শক্তি এবং বিভিন্ন শক্তিস্তরে তার কোয়ান্টাম লাফের ওপর নির্ভর করে নতুন তত্ত্বের ভাবনা শুরু করেন।
সেই গ্রীষ্মেরই এক রাতভর গণনা শেষে ভোররাত তিনটার দিকে হাইজেনবার্গ তাঁর ঐতিহাসিক গাণিতিক সমাধানে পৌঁছান। আবিষ্কৃত হয় কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক রূপ, যা কেবল হাইড্রোজেন নয়, মহাবিশ্বের অন্য সব পরমাণু, উপ-পারমাণবিক কণা ও অণুর বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটনে সক্ষম ছিল। প্রবল উত্তেজনায় না ঘুমিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে দ্বীপের একটি পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসেন এবং কোয়ান্টাম যুগের সূচনালগ্নে নতুন সূর্যের উদয় প্রত্যক্ষ করেন। যদিও জটিল ম্যাট্রিক্স বা সংখ্যার সারণিতে আবদ্ধ এই তত্ত্বে কোয়ান্টাম জগতের কোনো চাক্ষুষ রূপ দেখা যেত না।
এর মাত্র এক বছর পরই অস্ট্রিয়ান-আইরিশ পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এক সমতুল্য ও দৃশ্যমান বিকল্প মডেল উপস্থাপন করেন। ১৯২৫ সালের তরঙ্গ সমীকরণ এবং গ্রিক অক্ষর সাই (ψ) দ্বারা চিহ্নিত তরঙ্গ ফাংশনের মাধ্যমে তিনি দেখান যে, কোয়ান্টাম কণিকারা কোনো সুনির্দিষ্ট বিন্দুতে আটকে না থেকে সম্ভাবনার মেঘ হিসেবে স্থানজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। যেখানে তরঙ্গের চূড়া থাকে সেখানে কণাটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এবং দূরবর্তী লেজের অংশে তা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও বিদ্যমান। ডাবল-স্লিট পরীক্ষার মতো ঘটনায় ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম ও আত্ম-ব্যতিচারের ব্যাখ্যাও এই সমীকরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। যেখানে সনাতন পদার্থবিজ্ঞান ফলাফল নিশ্চিত করে, সেখানে কোয়ান্টাম কাঠামো সম্ভাবনার ভিত্তিতে সময়ের সঙ্গে তরঙ্গ ফাংশনের বিবর্তন নির্দেশ করে।
পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে হাইজেনবার্গ প্রণয়ন করেন তাঁর যুগান্তকারী অনিশ্চয়তা নীতি, যা কোয়ান্টাম জগতের এই অনির্ধারিত স্বভাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। সমীকরণটি হলো Δx . Δp ≥ ℏ/2, যেখানে Δx এবং Δp যথাক্রমে x-দিক বরাবর অবস্থান ও ভরবেগের অনিশ্চয়তা নির্দেশ করে এবং ℏ হলো মৌলিক সংশোধিত প্লাঙ্ক ধ্রুবক। এই নীতি অনুসারে কোনো যন্ত্রের ত্রুটি ছাড়াই প্রকৃতির অন্তর্নিহিত নিয়মে কণার অবস্থান যত নিখুঁতভাবে জানা যাবে, তার ভরবেগ ততটাই অনির্দিষ্ট হয়ে পড়বে। দাঁড়িপাল্লার ভারসাম্যের মতো অবস্থান নিশ্চিত করতে গেলে কণার গতি বা ভরবেগের অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, কোয়ান্টাম কণাকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থায়ীভাবে আটকে রাখা অসম্ভব; তাকে আবদ্ধ করার চেষ্টা করলেই তা স্থানজুড়ে ঝাপসা সম্ভাবনার মেঘের আকারে পুনরায় ছড়িয়ে পড়ে।
আপনার মতামত লিখুন