তারল্যসংকটে থাকা ছয় ব্যাংকে আটকা চট্টগ্রাম বন্দরের ১,২০০ কোটি টাকা, আদায়ে সংসদীয় কমিটির তাগিদ
চট্টগ্রাম বন্দর
তীব্র তারল্যসংকটে পড়া ছয়টি ব্যাংকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) আটকে গেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক মানদণ্ড (আইএফআরএস) মেনে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির কোনো হিসাবভিত্তিক সংস্থান না রেখেই এ আমানত রাখা হয়েছিল, যার অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। আজ সোমবার জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষ অর্থ ফেরত না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত উদ্ধারে জোর তাগিদ দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বমোট ১১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যে পদ্মা ব্যাংকে রয়েছে ১৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে রয়েছে ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। চরম সংকটে থাকা এই ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংককে ইতোমধ্যে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সরকারি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব আমানত রাখা হয়েছিল; বর্তমানে মূল টাকার পাশাপাশি এফডিআরের মুনাফাও পুরোপুরি আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
বৈঠকে বন্দরের অন্যান্য কার্যক্রম পর্যালোচনায় জানা যায়, লালদিয়ায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভারী পণ্য ওঠানো-নামানোর জেটি নির্মাণের সমঝোতা স্মারক নৌবাহিনীর সঙ্গে স্বাক্ষর করা হলেও এক বছরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে চুক্তিটি বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হওয়া চুক্তির লাভ-ক্ষতি নিয়ে সংসদীয় কমিটি জানতে চাইলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরিচালনা সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরে। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত উদ্ধার, দীর্ঘদিনের নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তি, সরকারি অর্থের সুরক্ষা, নিলামযোগ্য কনটেইনার ও যানবাহন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং প্রকল্প নিয়ে বৈঠকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। পায়রা বন্দরের প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০০-১০৫ মিটার প্রশস্ত চ্যানেলে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা অর্জনের কথা থাকলেও ড্রেজিং শেষে প্রাক্-জরিপের মতোই গভীরতা ৫ মিটারে অপরিবর্তিত থাকে। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়েও পুরো অর্থ ছাড় করার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে কমিটি। অন্যদিকে, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ৭ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা এবং জেটিতে ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর উদ্দেশ্যে ১২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় ড্রেজিং করা হলেও নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের রিপোর্টে গভীরতা পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৫ মিটার। অতিরিক্ত পলি জমার কারণ দেখানো হলেও সঠিক সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে জড়িত কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কাজের শর্ত হিসেবে ঠিকাদারকে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত গভীরতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, সদস্য তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন।





আপনার মতামত লিখুন