সিয়াং মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প: অরুণাচলে আদিবাসীদের তীব্র অসন্তোষ ও দিল্লি-বেইজিং সংঘাতের সমীকরণ
জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ঘিরে অরুণাচল প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকার উগেং-কমকার এলাকায় মাসখানেক আগে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মূলত প্রস্তাবিত ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পূর্ববর্তী ড্রিলিং ও জরিপ কাজের সুরক্ষার্থেই এই পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন। তবে ব্যাপক প্রস্তুতি ও কড়া নজরদারি সত্ত্বেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অসন্তোষ প্রশমিত হয়নি। বিরোধিতার জেরে গত ১৪ অক্টোবর ২০১৪ সালের রাজ্য বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের আওতায় চার আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে আপার সিয়াংয়ের গেকু অঞ্চলে নতুন করে রাজপথে নামে জনতা। একই সঙ্গে সিয়াং আদিবাসী কৃষক ফোরামের (এসআইএফএফ) যুব শাখা সরকারের সঙ্গে যে কোনো ধরনের আলোচনা বর্জনের ডাক দিয়েছে।
হিমালয়ের কৈলাস পর্বতের অদূরে মানস সরোবরের জিমা ইয়ংজং হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া খরস্রোতা এই নদী তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। অরুণাচলে প্রবেশের পর এর নাম হয় সিয়াং, যা আসাম হয়ে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে সাগরে মিশেছে। স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠীর আশঙ্কা, মেগা বাঁধটি রূপায়িত হলে তাদের আদিপুরুষের ভিটেমাটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডুর সফরের সময় স্থানীয় বিধায়কের বাসভবনে হামলা ও পুলিশের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ৪ অক্টোবরের সংঘর্ষে অগ্নিসংযোগ ও যৌথবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৮ অক্টোবর অরুণাচলের ভূমিপুত্র তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজেজু প্রবীণ আদি নেতাদের সাথে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একসঙ্গে বসে আলোচনা করলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের কথা বলতে হবে। সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
নদীকেন্দ্রিক এই সংঘাতের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। ২০১০ সালের আগস্টে রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে বাঁধবিরোধী জোট সিয়াং পিপলস ফোরামের তৎকালীন নেতা ওজিং তাসিংয়ের ইটানগরের বাসভবনে তল্লাশি চালানো হয়েছিল। তাসিং পরে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশের কাছে প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানান। গুয়াহাটিতে শুনানির পর রমেশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে লেখা চিঠিতে স্বীকার করেন যে বাঁধের কৌশলগত যুক্তি স্থানীয়দের আশ্বস্ত করতে পারছে না। সেখানে তিনি বিভিন্ন এনজিওর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, চীন ও ভারতের রেষারেষিতে অরুণাচলকে দাবার ঘুঁটি বানানো উচিত হবে না। এমনকি ২০১২ সালের মে মাসে বিজেপির তৎকালীন রাজ্যসভার সাংসদ তরুণ বিজয়ও প্রশ্ন তুলেছিলেন, আন্দোলনকারীদের চীনা মদদপুষ্ট আখ্যা না দিয়ে তাদের কাছে দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পাঠানো উচিত। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে পাসিঘাটে গিয়ে নরেন্দ্র মোদিও বড় বাঁধের ঝুঁকি মেনে নিয়ে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র প্রকল্পের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
বর্তমানে রাজনৈতিক মেরুকরণ সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বসিরাম সিরাম এক স্মারকলিপিতে জানান, উজানে চীনের পানি প্রত্যাহারের যুক্তিতে স্থানীয় আদিবাসীদের পূর্বস্বত্ব ও অধিকার খর্ব করা অনুচিত। সেপ্টেম্বরে ভারতীয় যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক তারহ জনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার আদিবাসীদের দাবির মুখে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডু প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়নে অনড় থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর বাঁধ বিরোধিতাকারী সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে ওজিং তাসিংয়ের ক্ষেত্রে; যিনি একসময় বাঁধের কট্টর বিরোধী ছিলেন, তিনি এখন খানডু মন্ত্রিসভার গ্রামীণ উন্নয়ন ও পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রী। নিজের আগের অবস্থান বদলে তাসিং এখন বলছেন, ‘আমরা যদি নিজেদের বাঁধ নির্মাণ না করি, আর চীন যদি তাদের বাঁধকে আমাদের বিরুদ্ধে “পানিবোমা” হিসেবে ব্যবহার করে; আমাদের ওপর তার প্রভাব কেমন হবে?’
এই প্রকল্পের মূলে রয়েছে ভারত ও চীনের সুদীর্ঘ ভূকৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৮২ সালে সিয়াং ও সুবনসিরি নদীর পানি নিয়ে ভারতের প্রথম পরিকল্পনায় চীন কোনো মুখ্য কারণ ছিল না। পরবর্তীতে ২০০২ সালে বেইজিংয়ের সাথে বর্ষাকালের জলতাত্ত্বিক তথ্য বিনিময়ের সমঝোতা হয়। ২০০৩ সালে ভারত ৫০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নেয়, যার ২৭ হাজার মেগাওয়াটই অরুণাচলে হওয়ার কথা ছিল। ২০১১ সালে সংসদে চীন কর্তৃক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধ নির্মাণের খবর আসার পর এবং ২০১৩ সালে চীনের বাড়তি প্রকল্পের বিপরীতে ভাটির দেশের অধিকার নিয়ে দিল্লি সরব হয়। ২০১৭ সালে নীতি আয়োগের পরামর্শে প্রস্তাবিত সিয়াং আপার স্টেজ-১ ও ২ একত্র করে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একক বহুমুখী জলাধারের রূপ দেওয়া হয়। বিপরীতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিব্বতের ভাটি অঞ্চলে ৬০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার এক বিশাল প্রকল্পের ছাড়পত্র দেয় বেইজিং। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে নদীর ২ হাজার মিটার খাড়া ঢালকে কাজে লাগিয়ে পাঁচটি ধাপে এই কেন্দ্র বানাবে চীন। এর ফলে ভাটিতে পানিপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ বিপুল পানি ছেড়ে কৃত্রিম প্লাবনের আশঙ্কায় পাল্টা প্রতিরোধক হিসেবে ভারত সিয়াংয়ে বড় জলাধার গড়তে চাইছে।
তবে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ড্যামস, রিভার্স অ্যান্ড পিপলসের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্করের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে তথাকথিত ‘প্রথম ব্যবহারকারীর অধিকার’-এর কার্যকর ভিত্তি নেই। তাঁর প্রস্তাব, স্থানীয়দের ওপর বাঁধ না চাপিয়ে ভারতের উচিত চীনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এবং যৌথ পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের অধিকার দাবি করা। এদিকে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বিচারব্যবস্থা ‘কেবাং’-এর ঊর্ধ্বে থাকা সর্বোচ্চ সামাজিক পরিষদ ‘বোগুম বোকাং কেবাং’ দীর্ঘ ২৫ বছর পর ২০২৫ সালের আগস্টে আপার সিয়াংয়ের গেকুতে এক বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে। এসআইএফএফ-এর মতে, এই বাঁধ হলে ২৭টি গ্রাম সম্পূর্ণ বিলীন হবে, বহু বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাস্তুহারা হবেন এক থেকে দেড় লাখ মানুষ। পূর্বপুরুষ ‘আবো তানি’র পুণ্যভূমি ও ‘আনে সিয়াং’ (মা) হিসেবে পূজিত এই নদী আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতীক। গুয়াহাটি থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী আদি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের এক সাবেক প্রতিনিধির তোলা প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে—জাতীয় নিরাপত্তার দায় কাদের বহন করতে হবে, উন্নয়ন কারা নির্ধারণ করবে এবং নদীপাড়ের মানুষদের সংস্কৃতি জলাঞ্জলি না দিয়ে নদীকে কাজে লাগানো যায় কি না।








আপনার মতামত লিখুন