মরুর বেদুইন থেকে চার দশকের অধিপতি: নর্দমার পাইপে যেভাবে রচিত হয়েছিল গাদ্দাফির অন্তিম পরিণতি
মুয়াম্মার গাদ্দাফি
টানা চার দশকের বেশি সময় ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে লিবিয়া শাসন করেছিলেন তিনি। তবে ৪২ বছরের সেই দীর্ঘ আধিপত্যের সমাপ্তি ঘটেছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নারকীয়ভাবে। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে রাস্তার পাশের একটি সংকীর্ণ নর্দমার পাইপে আশ্রয় নিয়েও রেহাই পাননি তিনি; সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে গুলি চালিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় তাঁর দেহ। আফ্রিকান রাষ্ট্র লিবিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার গাদ্দাফির জীবনের শেষ প্রহরগুলোতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা আজও এক বড় রহস্য। নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের কট্টর সমর্থক এবং আফ্রিকান ঐক্যের উদ্যোক্তা হিসেবে আরব ও আফ্রিকা অঞ্চলে তুমুল জনপ্রিয় হলেও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিনের এক চক্ষুশূল। চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই পশ্চিমা শক্তির সহযোগিতাতেই ক্ষমতার মসনদচ্যুত হন তিনি এবং তাদের মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের হাতেই প্রাণ হারাতে হয় তাঁকে। ঠিক ১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর এই দিনে মৃত্যু হয় আলোচিত এই শাসকের।
গাদ্দাফির এই উত্থান-পতনের ইতিহাস জানতে ফিরে যেতে হবে ১৯৪২ সালে। তৎকালীন ইতালীয় উপনিবেশে থাকা লিবিয়ার সিরতে অঞ্চলের এক সাধারণ বেদুইন পরিবারে জন্ম নেন তিনি। মরুভূমির সাদামাটা পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই তরুণ অল্প বয়সেই আরব জাতীয়তাবাদের আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। বিশেষ করে মিসরের নেতা জামাল আবদেল নাসেরের পশ্চিমা প্রভাবমুক্তি, আরব সংহতি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর চিন্তাধারায় স্থায়ী প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে একদল তরুণ অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে রাজতন্ত্র উৎখাতের এক গোপন ছক আঁকেন তিনি। সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর। তৎকালীন বাদশাহ সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিস বিন মুহাম্মদ আল মাহদি চিকিৎসার প্রয়োজনে তুরস্কে অবস্থান করছিলেন এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন যুবরাজ সাইদ হাসান-উর-রিদা আল-মাহদি। সেই সুযোগে যুবরাজকে গৃহবন্দী করে মাত্র ২৭ বছর বয়সে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন গাদ্দাফি। অভ্যুত্থানের পর ক্যাপ্টেন থেকে তিনি নিজের পদবি নির্ধারণ করেন কর্নেল। দায়িত্ব নিয়েই তিনি দেশে থাকা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করেন, জাতীয় তেলসম্পদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন এবং পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো থেকে বর্ধিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করে গোটা আরব বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
গাদ্দাফির কার্যকালে লিবিয়া অর্থনৈতিকভাবে তেলসমৃদ্ধ একটি প্রভাবশালী দেশে রূপ নেয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কারিগরি ও সামরিক সাহায্যে সুসজ্জিত প্রায় ৫০ হাজার সেনাসদস্য দিয়ে দেশের ১১টি সীমান্ত এলাকাকে ৪টি অঞ্চলে ভাগ করে কঠোর নজরদারিতে রেখেছিলেন তিনি। ওই সময়ে দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য লিবিয়া ছিল একটি আকর্ষণীয় ও লাভজনক কর্মক্ষেত্র। রাষ্ট্র পরিচালনার তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তিন খণ্ডে ‘দ্য গ্রিন বুক’ বা ‘সবুজ বই’ প্রকাশ করেন। এতে তিনি পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্র, মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘরানার কমিউনিজমের তীব্র সমালোচনা করে আরব জাতীয়তাবাদ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও ইসলামি অনুশাসনের সমন্বয়ে ‘তৃতীয় আন্তর্জাতিক তত্ত্ব’ তুলে ধরেন। জনগণের প্রত্যক্ষ শাসিত রাষ্ট্রের ধারণায় দেশের নতুন নামকরণ করা হয় ‘গ্রেট সোশ্যালিস্ট পিপলস লিবিয়ান আরব জামাহিরিয়া’। যদিও বাস্তবে ক্ষমতার যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল গাদ্দাফি ও তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলের হাতে। চার দশকের শাসনামলে ভিন্নমত দমন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নিপীড়নের পাশাপাশি রাজধানী ত্রিপোলির রাজপ্রাসাদে শত শত নারীকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গাদ্দাফির আচার-আচরণ ও জীবনযাপনে ছিল নানা চমকপ্রদ দিক। বিদেশি সফরে গিয়ে অভিজাত হোটেলের পরিবর্তে নিজের ঐতিহ্যবাহী বেদুইন তাঁবুতে রাত্রিযাপন করা ছিল তাঁর অন্যতম পছন্দ, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০০৪ সালের বেলজিয়াম সফরে। প্রথাগত স্যুট-টাই বর্জন করে তিনি জনসমক্ষে হাজির হতেন বিশেষ নকশার সামরিক কিংবা উজ্জ্বল আফ্রিকান পোশাকে এবং চোখে থাকত রোদচশমা। তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকত ‘অ্যামাজোনিয়ান গার্ড’ নামে পরিচিত সশস্ত্র নারী দেহরক্ষী দল। আফ্রিকা মহাদেশকে একতাবদ্ধ করার প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে ২০০০-এর দশকে তিনি আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় জোরালো ভূমিকা পালন করেন এবং সংস্থাটির মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ একাই বহন করত লিবিয়া। ফলস্বরূপ, ইথিওপিয়ায় আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার প্রাক্কালে ২০০৮ সালে দুই শতাধিক আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী রাজা ও আদিবাসী নেতা তাঁকে ‘আফ্রিকার রাজাদের রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আশির দশকে গাদ্দাফির সম্পর্ক পৌঁছায় চরম তিক্ততায়। ফিলিস্তিন মুক্তির লড়াইয়ে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৮২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তেল খাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সরবরাহ আটকে দেয়। পরিস্থিতি আরও নাটকীয় মোড় নেয় ১৯৮৮ সালে, যখন স্কটল্যান্ডের লকার্বির আকাশে একটি যাত্রীবাহী বিমান বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে ২৭০ জন আরোহী নিহত হন। আন্তর্জাতিক তদন্তে এ ঘটনায় গাদ্দাফি প্রশাসনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় দেশটির ওপর জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে তীব্র বৈশ্বিক চাপের মুখে লিবিয়া ওই ধ্বংসযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার করে হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে রাজি হয়। একই বছরে গাদ্দাফি নিজের গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির সমস্ত কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা দিলে জর্জ ডব্লিউ বুশের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয় এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে গাদ্দাফির কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
তবে ২০১১ সালের শুরুর দিকে ছড়িয়ে পড়া ‘আরব বসন্তের’ উত্তাল ঢেউ বদলে দেয় লিবিয়ার ভাগ্যরেখা। তিউনিসিয়ায় জাইন আল-আবিদিন বেন আলী এবং মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পরপরই লিবিয়ার বেনগাজি শহর থেকে গাদ্দাফিবিরোধী তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। এই অভ্যুত্থান রোধে গাদ্দাফি ভারী গোলাবারুদ ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে কঠোর দমননীতি বেছে নেন। সংঘাত গৃহযুদ্ধে রূপ নিলে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর প্রত্যক্ষ বিমান সহায়তায় গাদ্দাফিবিরোধী অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল (এনটিসি) দেশজুড়ে সামরিক আক্রমণ জোরদার করে। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে বিদ্রোহী যোদ্ধারা ত্রিপোলিতে প্রবেশ করে এবং ২৩ আগস্ট তারা গাদ্দাফির প্রধান প্রশাসনিক ঘাঁটি আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড নিজেদের কব্জায় নেয়। ত্রিপোলির পতনের পর গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী তাঁর জন্মশহর সিরতে গিয়ে শেষ প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তোলে।
সিরতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর ভোরে একটি শক্তিশালী গাড়ি বহর নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিলেন গাদ্দাফি ও তাঁর সহচরেরা। কিন্তু ন্যাটো বাহিনীর আকস্মিক বিমান হামলায় গাড়িগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং বহরের বহু সহযোগী প্রাণ হারান। কোনোমতে বেঁচে যাওয়া গাদ্দাফি ও তাঁর কয়েক সঙ্গী সড়কের পাশের একটি নালা বা নর্দমার পাইপে গা ঢাকা দেন। কিন্তু অচিরেই বিদ্রোহী যোদ্ধারা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে পাইপ থেকে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে। আহত গাদ্দাফিকে প্রহার ও অপদস্থ করার একাধিক ভিডিও সে সময় মুঠোফোনে ধারণ করা হয়, যা দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এনটিসি প্রধান মাহমুদ জিবরিল তখন দাবি করেছিলেন, ক্রসফায়ারে পড়ে গাদ্দাফি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) বিস্তারিত তদন্তে বেরিয়ে আসে, পাইপ থেকে জীবিত উদ্ধারের সময় গাদ্দাফির মাথায় কোনো প্রাণঘাতী জখম ছিল না; বরং আটকাবস্থায় অমানুষিক নির্যাতনের পর তাঁকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। একই দিনে আটকাবস্থায় প্রাণ হারান তাঁর ছেলে মুয়াতাসিম গাদ্দাফিও। পরে নিহত গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতা শহরের একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের শীতলীকরণ কক্ষে সাধারণ জনতার প্রদর্শনের জন্য কয়েক দিন রাখা হয়েছিল।
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মন্তব্য করেছিলেন, লিবিয়ার জনগণ নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পেলেও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথ হবে অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। বাস্তবেও দেখা গেছে, গাদ্দাফির অবসানের দেড় দশক পরও উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে শান্তি ফেরেনি। বর্তমানে দেশটি দুটি বিবদমান প্রশাসনিক ধারায় দ্বিখণ্ডিত—পশ্চিমাঞ্চল শাসিত হচ্ছে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের অধীনে এবং পূর্বাঞ্চল রয়েছে সেনাপতি খলিফা হাফতারের প্রভাবাধীন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। ২০২০ সালে বড় ধরনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র মিলিশিয়াদের কর্তৃত্ব এখনো অটুট রয়েছে। সংকট নিরসনে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে একটি বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের কথা থাকলেও রাজনৈতিক কোন্দলের জের ধরে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। ২০১১ সালের পটপরিবর্তনের ঠিক দুই বছর পর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের এক জনমত সমীক্ষায় প্রকাশ পায়, মাত্র ৩২ শতাংশ লিবীয় বিশ্বাস করেন বিপ্লব-পরবর্তী দেশ আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। কয়েক বছর আগে লিবিয়ার শিক্ষাবিদ মুস্তফা ফেতোউরি ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানান, সাবেক শাসক গাদ্দাফির জমানার সঙ্গে মেলালে আজকের লিবিয়ায় সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো অস্তিত্বই নেই।





আপনার মতামত লিখুন