সরকারই পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার
জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে
সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টনে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিএনপির সংসদ সদস্যদের কোটি কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে বিরোধী দল দাবি জানালে অন্য খাত থেকে নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। শিশুদের কান্না থামাতে চকলেট দেওয়ার মতো বিরোধী দলকে চকলেট দিয়ে ভুলিয়ে রেখে সরকারি দল নিজেরা বিরিয়ানি খাচ্ছে।
বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে একাকার করে ফেলছে উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের বিভিন্ন অন্যায় ও অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। নিজেদের একদলীয় আধিপত্য বজায় রেখে সরকার কার্যত ফ্যাসিবাদের পুনরাগমনের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, অনিয়ম ও চরম দুর্নীতি আড়াল করতে সরকার জুজুর ভয় দেখিয়ে সব দোষ বিরোধী শিবিরের ওপর চাপানোর চক্রান্ত করছে। বিরোধীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে অবহেলা করে যে অস্থিরতার সৃষ্টি করা হচ্ছে, মূলত সেই পথ ধরেই সরকার সচেতনভাবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ঢোকার সুযোগ করে দিচ্ছে। এছাড়া গত কয়েক মাসে সরকারের তিনজন মন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্য বিদায় নেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের দোলাচল ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী দল জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে না—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এমন বক্তব্যকে সম্পূর্ণ হাস্যকর আখ্যা দিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, নিজের দুর্বলতা ঢাকতে মানুষ এমন অবান্তর কথা বলে। জামায়াতসহ ১১টি দল জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বলেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। বরং বিএনপি গণভোট অস্বীকার করায় তারাই জুলাইয়ের চেতনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনে বিরোধীদলীয় নেতার না যাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি জানান, বিরোধীদলীয় নেতাকে কার্ড পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ জানানো হলেও সেই কার্ড কিংবা অতিথি তালিকার কোথাও তাঁর নাম ছিল না। তিনি কি সেখানে সাধারণ দর্শকের সারিতে গিয়ে বসবেন—এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দল সহায়তা করছে না—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন মন্তব্যের জবাবে জামায়াত নেতা বলেন, সংবিধান সংস্কারে বিরোধী দলের আলাদা সহায়তার প্রয়োজন নেই, কারণ দেশের জনগণ ইতিমধ্যে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানে জুলাই সনদ অনুমোদন করে দিয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে গণভোটের রায় কার্যকর করতে বিরোধী দল পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে একদলীয় কোনো কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করার অপচেষ্টায় বিরোধী দল কখনো অংশ নেবে না।
গত রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর দেওয়া এক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে দেখেই ফ্যাসিবাদের স্বরূপ চিনেছে। মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে রিজভী সাহেব ফ্যাসিবাদের চরিত্র ভুলে গেছেন। ফ্যাসিবাদের প্রকৃত রূপ জানতে হলে তাঁকে নিজের দলের কর্মীদের কাছে যেতে হবে, কর্মীরাই ফ্যাসিবাদের কাজ সম্পর্কে বলতে পারবে। চাঁদাবাজি, লুণ্ঠন, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা এবং ক্ষমতার জোরে গণরায় উপেক্ষা করাই ফ্যাসিবাদের লক্ষণ, আর বিএনপি বর্তমানে সেই পথেই হাঁটছে। এছাড়া ১৯৯৪-৯৫ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, জামায়াত কখনো আওয়ামী লীগের সাথে জোট গঠন করেনি। তৎকালীন সময়ে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অস্বীকার করায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বাম দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী লিয়াজোঁ কমিটির যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াত শরিক ছিল। তখনকার বিএনপির গণবিরোধী ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল, জামায়াত তাদের ক্ষমতায় আনেনি।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, কুষ্টিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজার মাহফিলে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি ঠেকাতে না পেরে প্রশাসন তা বন্ধ করে দিচ্ছে। সরকারকে এ পথ পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপিও চাইলে ওয়াজ ও কোরআনের তাফসির মাহফিলের আয়োজন করে দেখতে পারে কার মাহফিলে কত মানুষের সমাগম ঘটে। পাশাপাশি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার সব গভর্নিং বডি ও পরিচালনা কমিটি ভেঙে দেওয়ার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাদ দিয়ে দলীয় মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে সরকার হাজার হাজার মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা করছে।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার এটিকে চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার থাকা সত্ত্বেও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে তা সরকারের নজরে আসেনি এবং দূতাবাসও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সরকারের টনক নড়েছে। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন ও মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।





আপনার মতামত লিখুন