সৌদি শ্রমবাজারে সংকট ও প্রবাসীদের বিপদ: সুরক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন
সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রবাসী কর্মীরা এসেছেন ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় যেতে পারছেন না তাঁরা
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে মন্দা, নিরাপত্তাজনিত হুমকি কিংবা বিমানবন্দরগুলোতে উদ্ভূত অচলাবস্থা, ফ্লাইট বাতিল ও ভিসা জটিলতায় আটকে পড়া বাংলাদেশি কর্মীদের দুরবস্থা এক গভীর প্রশ্ন সামনে এনেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখা এই মেহনতি মানুষদের চরম সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রের সুরক্ষামূলক প্রস্তুতি ঠিক কতটা দৃশ্যমান, তা এখন ভাবার বিষয়। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের হিসাবে রাষ্ট্রীয় আগ্রহ যতটা প্রবল, তাঁদের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় সেই মাত্রার দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন দেখা যায় না। এটি শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং নীতিগত অগ্রাধিকার, জাতীয় দূরদর্শিতা ও নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রবাসীদের ‘অর্থনীতির যোদ্ধা’ ও তাঁদের উপার্জনকে উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার পরও বিপর্যয়ে তাঁদের রক্ষায় জোরালো পরিকল্পনা না থাকা সার্বিক উন্নয়ন দর্শনের বড় এক দুর্বলতা।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ শ্রমবাজার সৌদি আরবে নির্মাণ, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা ও গৃহস্থালির মতো নানা খাতে বহু কর্মী নিয়োজিত। সেখানে কাজের সুযোগ সংকুচিত হলে বা স্থানীয় নিয়োগবিধি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে কর্মী পরিবারগুলোর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপে পড়ে। অতিসম্প্রতি রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণাঞ্চলে সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলো হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় ধোঁয়া ওঠার ঘটনা আঞ্চলিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। তবুও সীমিত দক্ষতা এবং হাতে গোনা কয়েকটি বাজারের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে অভিবাসন খাতটি বরাবরই চরম ঝুঁকির মুখে থেকে যাচ্ছে। কয়েক মাসের জন্য সৌদি আরবে কর্মী নেওয়া কমলে ঠিক কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কত পরিবার ঋণের দায় শোধে ব্যর্থ হবে কিংবা দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের বিকল্প আয়ের উপায় কী—এমন আগাম হিসাব ও পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে কেবল হঠাৎ আসা দুর্যোগ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
নিরাপত্তা সংকট বা সংঘাতের জেরে বিমান যোগাযোগ ব্যাহত হলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত, ছুটিতে থাকা ও সৌদি আরবে আটকে থাকা কর্মীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। টিকিট নষ্ট হওয়া, চাকরিতে যোগদানের সময়সীমা পেরোনো, ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া ও বাড়তি খরচের মতো সমস্যা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মীরা দালালের ফাঁদে না পড়েন। আটকে পড়া কর্মী, দেশে আটকে থাকা শ্রমিক ও নতুন যাত্রীদের বিস্তারিত অবস্থান, ভিসা, চুক্তি, বকেয়া ও ঋণের তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরি করা জরুরি। দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বিমান সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার বাস্তব সমাধানের সংখ্যা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
জরুরি সংকট মোকাবিলায় একটি স্থায়ী সুরক্ষা তহবিল ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যাবশ্যক, যেখানে মহামারি বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে তহবিল জোগান ও সংস্থার দায়িত্ব পূর্বনির্ধারিত থাকবে। বহুভাষিক হটলাইন, দ্রুত নিবন্ধন, নিরাপদ আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আইনি সহযোগিতার পাশাপাশি সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভিসা বা চাকরির মেয়াদ বাড়ানো এবং বিনা খরচে টিকিট পুনঃনির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিদেশে যেতে ঋণগ্রস্ত কর্মীদের কিস্তি পরিশোধে ছাড় ও আর্থিক সহায়তায় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা আবশ্যক। একই সঙ্গে দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি অভিযোগের জন্য ট্র্যাকিং নম্বর চালু করে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সভা-বিবৃতির সংখ্যার চেয়ে কতজনের চাকরি রক্ষা পেল বা বকেয়া আদায় হলো, সেটাই আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের (সিএমএস) সমন্বয়ক ও সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা।





আপনার মতামত লিখুন